সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
অক্টোবর / ২২ / ২০২২
হারিয়ে যাওয়া জনপ্রিয় কুস্তি খেলা হাওরাঞ্চলে দিন দিন আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।সামাজিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এই কুস্তি খেলাটি দুটি গ্রামের মধ্যে হয়ে থাকে। এই খেলার মাধ্যমে যুগযুগ ধরে আশপাশের গ্রামের লোকজনের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার হয় ও সামাজিক সম্প্রীতি অটুট থাকে। অন্যদিকে উঠতি বয়সী তারুণ্য মাদক ও অসামাজিক কাজ থেকে বিরত থাকার সুযোগ পায়।
গত এক সপ্তাহে সুনামগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় বর্ষা মওসুমের প্রিয় খেলা কুস্তি অন্তত ৩৫টি গ্রামের মধ্যে আলাদা ভাবে কুস্তি খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় এই খেলা উপভোগ করেন প্রায় লাখো দর্শক উপভোগ করেছেন। বর্ষায় যখন কাজ থাকে না তখন গ্রামের যুবকরা কুস্তি খেলে থাকলেও সম্প্রতি বর্ষা মওসুমের পরও হেমন্ত পর্যন্ত এই খেলাটি চলছে। তবে সময়ের প্রয়োজনে ও আরো সুশৃঙ্খল করতে কিছু নিয়ম-কানুন করা দরকার বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
খোজ নিয়ে জানাযায়,জেলার সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার অন্তত শতাধিক গ্রামে এ পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী খুস্তি খেইড় অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এক সময় সুনামগঞ্জের দুর্গম যাতায়াতের কারণেই আগের দিন চলে আসতেন কুস্তিগীর ও তাদের লোকজন। কিন্তু এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে আর স্বাগতিক গ্রামে অতিথি হয়ে আসেন না লোকজন। এদিকে খেলাটিকে আরো শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে এগিয়ে এসেছে সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থাও। আগামী ২৯-৩০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই খেলাটি।
স্থানীয় ভাষায় সম্প্রীতির এই খেলাটিকে ‘ভাইয়াপি কুস্তি খেইড়’ ও ‘দাওয়াতি কুস্তি খেইড়’ হিসেবে ডাকেন। তবে গত এক দশক ধরে এর বাইরেও টুর্নামেন্ট আকারে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে কুস্তি খেলা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন গ্রামের সেরা কুস্তিগীররা অংশগ্রহণ করে থাকেন। এসব খেলায়ও গ্রাম ভেঙে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন।
কুস্তি খেলার সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান,স্বাগতিক গ্রাম খেলোয়াড়দের নিয়ে আগের দিনই আমন্ত্রিত গ্রামে চলে আসে। তাদের বিশেষ রান্নাবান্নায় আপ্যায়ন করা হয়। পৌঁছে দেওয়া হয় মাঠে। সারাদিন খেলা শেষে আবারও আপ্যায়িত হয়ে চলে যান নিজ গ্রামে।
খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ পরিভাষা। খেলার মাঠকে বলা হয় ‘তলা’। যারা খেলা দেখেন সেই দর্শকদের বলা হয় ‘তামিশকির’ বা দর্শক। বিজয়ী কুস্তিগীর বা তার দলকে উৎসাহ দিতে গাওয়া হয় ‘হাইর’ যা শায়ের বা গীতের প্রতিশব্দ। ঐতিহ্যের এই কুস্তি খেলার কৌশলকে কুস্তির ভাষায় বলা হয় ‘প্যাছ’। সেই প্যাছের রয়েছে নানা নাম। ‘বাল্লা, আউকরা, বস্তাটান, গাড়িমুছকা, বাইমা প্যাছ’ ইত্যাদি। এসব প্যাছ দিয়েই এক কুস্তিগীর আরেক কুস্তিগীরকে পরাজিত করেন। খেলা পরিচালনা করেন সাবেক কুস্তিগীররা। যাদেরকে কুস্তির ভাষায় ‘আমিন’ বলা হয়। কোন প্রচার প্রচারণা ছাড়াই দর্শকরা মাঠে গিয়ে উপস্থিত হন। বিজয়ীদের সঙ্গে নেচে গেয়ে আনন্দ উদযাপন করেন।
দাওয়াতি বা ভাইয়াপি কুস্তিখেইড় দিনভর চলে। তিন পর্বে খেলা চলে। প্রাথমিক পর্বে উঠতি কুস্তিগীররা খেলে থাকেন। দ্বিতীয় পর্বে হয় ছানি দাগা। চূড়ান্ত পর্বে হয় দাগার খেলা। দাগার খেলায় আলোচনা সাপেক্ষে দুই গ্রাম ৫ থেকে ১০ জন করে খেলোয়াড় খেলে থাকেন। তাদের জয়-পরাজয়েই নিষ্পত্তি হয় খেলা। এভাবে কোন সাংগঠনিক কাঠামো বা বিধিবদ্ধ নিয়ম ছাড়াই জনশ্রুতির মাধ্যমে খেলাটি পরিচালনা হয়ে আসছে।
কুস্তি খেলা দর্শক রুহুল আমিন বলেন,কুস্তি খেলা এই অঞ্চলের সামাজিক সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এই কুস্তি খেলাটি দুটি গ্রামের মধ্যে হয়ে থাকে। কুস্তিগীরের বন্দনা করে গ্রামের গীতিকবি রচনা করেন নানা স্তূতিমূলক গান। খেলায় বিজয়ী হতে তরুণরা খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকে নিজেদের প্রস্তুতি নেন। ভাইয়াপি কুস্তি খেলা দেখার মজাই আলাদা তা বলে বুজানো যাবে না।
সাবেক কুস্তিগীর বর্তমানে কুস্তিখেলার আমিন ও দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার কামাল হোসেন বলেন, কুস্তি খেলা আমাদের ঐতিহ্য। শত শত বছর ধরে খেলা চলছে। খেলার কারণে তরুণরা খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকে শরীর গঠনে আত্মনিয়োগ করে। স্বাগতিক ও আমন্ত্রিতত গ্রামের গণ্যমান্য প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ তরুণ কুস্তিগীরদের আগ্রহ দেখে দিনক্ষণ ঠিক করে খেলার আয়োজন করেন। সুদূর অতীত থেকে এভাবেই জনপ্রিয় এই কুস্তিখেইড় চলে আসছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দুই গ্রামের মধ্যে ভাইয়াপি খেলা আমাদের বন্ধনকেও শক্ত করছে।
সুনামগঞ্জ কুস্তি একাডেমির আহ্বায়ক ও মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মঈনুল হক বলেন,সুদূর অতীত থেকে কোন সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়াই কেবল মুরুব্বীদের তত্ত্বাবধান ও কুস্তিগীরদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় খেলাটি নির্বিঘে্ন চলছে সুনামগঞ্জের কয়েকটি উপজেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় এই কুস্তি খেলা। যে কোন গ্রামে খেলাটি হলে হাজার মানুষ কোন আমন্ত্রণ ছাড়াই দেখতে যান। এতে সমাজে সম্প্রীতি রক্ষার পাশাপাশি আমাদের তরুণরাও নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছে।