নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর / ২২ / ২০২২
সিলেটে আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা এই জেলার অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার স্বার্থে এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষিজ শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর আহবান জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিনিয়োগে আকৃষ্টকরণ ও সেই লক্ষ্যে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
শনিবার সকালে সিলেট সার্কিট হাউজ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘লোকাল লেভেল স্টেকহোল্ডারস কনসালটেশন অন ইনক্লুসিভ, স্মোথ এন্ড সাসটেইনেবল এলডিসি গ্রাজুয়েশন’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এ অভিমত উঠে আসে।
সিলেট জেলা প্রশাসন ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সহায়তায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-ইআরডির ‘সাপোর্ট টু সাস্টেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্প’ এই কর্মশালার আয়োজন করে।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ইআরডি সচিব শরিফা খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাহমিন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো মজিবর রহমান।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি-সিডিপি’র ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের সকল মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়েছে।
সিডিপি ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরব্যাপী প্রস্ততিকালীন সময়সহ বাংলাদেশের উত্তরণ সুপারিশ করেছে। এরপর তা ইসিওএসওসিতে অনুমোদিত হয়েছে এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও তা অনুমোদন করেছে। ফলে, পাঁচ বছর প্রস্তুতিকালীন সময় শেষে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে।
উত্তরণ প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করার লক্ষ্যে সরকার ভিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’ সংক্রান্ত একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। উত্তরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন মৌলিক বিষয়সমূহ নিয়ে কাজ করার জন্য জাতীয় কমিটির দিকনির্দেশনায় সাতটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী প্রস্তুতিকালীন উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে মতবিনিময়ক্রমে একটি ‘স্মোথ ট্যান্সিশন স্ট্যাটেজি-এসটিজি’ প্রণয়নের লক্ষ্যে ইআরডি সচিবের নেতৃত্বে ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের সহনেতৃত্বে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি উপকমিটি কাজ করছে।
উত্তরণের সম্ভাব্য প্রভাবসমূহ চিহ্নিতকরণ, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, উত্তরণ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/ বিভাগসমূহকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দান ও এই ঐতিহাসিক অর্জনকে দেশে বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রচারের লক্ষ্যে ইআরডির অধীনে ‘সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন প্রজেক্ট-এসএসজিপি’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় স্বল্পোন্নত দেশ হতে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনাসমূহ সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ের অংশীদারদের অবহিত করা এবং উত্তরণ প্রক্রিয়াটি মসৃণ ও টেকসইকরণের প্রক্রিয়ায় তাদেরকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে এসএসজিপি প্রকল্পের সহায়তায় এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইআরডি সচিব শরিফা খান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের একটি বিষয়. যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশ ও জাতির মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
অতীতে বাংলাদেশ সফলভাবে বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতা সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণ পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশ সম্মিলিভাবে উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।
বিশেষ অতিথি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাহমিন আহমেদ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের লক্ষ্যে স্থানীয় লোকবলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির উপর জোর দেন।
কর্মশালার সভাপতি সিলেটের জেলা প্রশাসক মো মজিবর রহমান আশা প্রকাশ করেন, উত্তরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও এসএসজিপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ফরিদ আজিজ। তিনি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কি প্রভাব পড়তে পারে বা নতুন কি সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে সেই বিষয়ে স্থানীয় বেসরকারি খাত বিশেষত রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিনিধিদের মধ্যে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
কর্মশালায় ‘ইনক্লুসিভ, স্মোথ এন্ড সাসটেইনেবল এলডিসি গ্রাজুয়েশন : চ্যালেঞ্জেজ এন্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক বিষয় উপস্থাপনা করেন যুগ্ম সচিব ও এসএসজিপি প্রকল্পের কম্পোনেন্ট ম্যানেজার মো আনোয়ার হোসেন। এছাড়া ‘ পারটিসিফেশন অব প্রাইভেট সেক্টর এন্ড আদার স্টেকহোল্ডারস এট সাব-ন্যাশনাল লেভেলস ফর গ্রাজুয়েশন উইথ মোমেন্টাম : স্ট্র্যাটেজি গোয়িং ফরওয়ার্ড’ বিষয় উপস্থাপনা করেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট- বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম।
বক্তাগণ বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া ও এর প্রভাব বিস্তারিতভাবে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে তুলে ধরেন। স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় শিল্পখাত বিশেষতঃ কৃষিজ শিল্প ও রপ্তানি খাতসমূহকে আরও উৎপাদনশীল ও বহুমুখী করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
পাশাপাশি নারী ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অধিকতর ব্যবসা-বান্ধব ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সকল অংশীজনের কার্যকর ভূমিকার বিষয়ে কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আশফাক আহমেদ, বারাকা পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুব্রত দাস।
পরে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিলেট জেলা প্রেসক্লাব সভাপতি আল আজাদ সহ বিভিন্ন দপ্তর ও শ্রেণিপেশার কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, ইআরডি ও এসএসজিপি প্রকল্পের কর্মকর্তাবৃন্দ, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।